কপোতাক্ষের চরে সবুজের হাতছানি, কয়রায় মিনি সুন্দরবন

কয়রা ডেস্ক : গোধুলীর আলো যখন সুন্দরী, কেওড়া ও বাইন গাছগুলোর মাথার ওপর আছড়ে পড়ে তখন আবীর আর সবুজের মাখামাখিতে মুগ্ধ হতে হয়। ভর দুপুরে বলাকা, ঘুঘুসহ নাম না জানা অসংখ্য পাখপাখালীর বিশ্রাম নিকেতন। সবুজের নিত্য শ্বাস-প্রশ্বাস, পাখির কিচিরমিচির, দখিণা বাতাসে কেওড়া-বাইন-সুন্দরী পত্রপল্লবের নয়নাভিরাম নৃত্য হৃদয়ে দোল দিয়ে যায়। সর্বদাই দুর্যোগ প্রবন এলাকা হিসেবে পরিচিত কয়রা উপজেলাকে রক্ষা করে চলেছে এসব গাছ গাছালি। মাত্র দেড় যুগের মধ্যেই প্রায় তিন মাইল এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে একটি বন। স্থানীয় মানুষ তাই এটাকে নাম দিয়েছে মিনি সুন্দরবন। খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার সর্ব পশ্চিমে কপোতাক্ষের তীরে প্রাকৃতিকভাবেই এ গাছগাছালি গড়ে উঠেছে। একশ্রেণির সুবিধাবাদি মহল এসব গাছ কেটে লবন চাষ ও ফুটবল খেলার মাঠ তৈরীর উদ্যোগ নিলেও এলাকাবাসীর হস্তক্ষেপে সে অপচেষ্টা রোধ করা হয়।
গোবরা গ্রামের পাশে কপোতাক্ষের তীরে দীর্ঘ আঠার বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে তোলা হয়েছে ছোটখাট একটা সুন্দরবন। গ্রামবাসীদের রক্ষনাবেক্ষন ও প্রকৃতির দান:দু’এর সমন্বয় বনটি। সুন্দরবন থেকে চারা তুলে দফায় দফায় রোপনের পর বনটি আজ কয়রার অন্যতম অবকাশ যাপনের স্থানে পরিনত হয়েছে। বন তৈরী আর এর সংরক্ষনে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে কয়রার মানব কল্যাণ ইউনিট নামক একটি সেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন।
কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: বদিউজ্জামান ও থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শামসের আলী এ বনায়নে পাখির অভয়ারন্য তৈরির লক্ষ্যে গাছে মাটির খোপও বেঁধে দিয়েছেন।
এ সংগঠনের সভাপতি ইউনিট সভাপতি আল আমিন ফরহাদ বলেন, আমরা বন্যপাখির আবাসস্থল তৈরিতে সহোযোগিতার জন্য এ বনে মাটির খোঁপ দেয়ার উদ্যোগ নেই। উর্দ্ধতন প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ এ কাজে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন।
স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, একশ্রেণির অসাধু লোক সেখানে বন কেটে লবনের মাঠ বানানোর উদ্যোগ নেয়। এছাড়াও বনের ভেতর গাছ কেটে ফুটবল খেলার মাঠ তৈরীরও উদ্যোগ নেয় অপর একটি মহল। তবে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সেটি বন্ধ হয়। এখন খেলা আর অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রকে ছাড়িয়ে সব শ্রেণির মানুষের বিনোদনের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়েছে ওই এলাকাটি।
গোবরার মিনি সুন্দরবন ধ্বংসের উদ্যোগ এর পূর্বেও কয়েক বার নেয়া হয়েছে। প্রায় তিন বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই অপরূপ ম্যানগ্রোভ বনের একেবারে শৈশব কালেই একবার গলাটিপে হত্যার ব্যর্থ প্রয়াস চালায় বিসিক। ২০০০ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্নভাবে এখানে গাছ কেটে লবণের মাঠ বানাবার উদ্যোগ নেয় প্রতিষ্ঠানটি। স্থানীয় লোকজন, কয়রার সুশীল সমাজ, প্রশাসন সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় লবনের মাঠ বানাবার সেই তোড়জোড় ভন্ডুল হয় শেষমেশ। সে সময় এই বন রক্ষায় এগিয়ে আসেন কয়রা মানবাধিকার জোটের সভাপতি প্রভাষক আ ব ম আব্দুল মালেক, থানা নির্বাহী কর্মকর্তা শামিমুল হক সিদ্দিকিসহ অনেকে। কয়রা মানবাধিকার জোট গোবরার বন রক্ষায় সংবাদ সম্মেলনও করে কয়রা প্রেসক্লাবে। সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস ও নদী ভাঙন থেকে কিভাবে এই ছোট্ট বনটি পুরো সদর ইউনিয়নকে সুরক্ষা দিচ্ছে তার চিত্রও তুলে ধরা হয় সংবাদ সম্মেলনে।
এরপর দুই বছর আগে গোবরা গ্রামের ‘বন্ধন তরুণ সংঘ’ ফুটবল খেলার মাঠের জন্য পুনরায় বন সাফাইয়ের চেষ্টা চালায়। তবে স্থানীয় সচেতন মহলের হস্তক্ষেপে সে প্রচেষ্টা রোধ করা হয়। এ হস্তক্ষেপ না হলে হয়তো-অদ্ভুত হইচই, গোল আর চার-ছক্কার চিৎকারে চাপা পড়ে যেত সকাল সন্ধ্যা পাখির নিত্য কলতান।
এ বনের গুরুত্ব তুলে ধরে কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার বদিউজ্জামান বলেন, এ বনটি প্রকৃতির দান। এখানকার এ অংশটি ভাঙন কবলিত এলাকা। গাছ-গাছালি গড়ে ওঠায় আগের মত আর ভাঙন নেই। এখানে যাতে আরও গাছ গাছালি গড়ে ওঠে সে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
কয়রা মানবাধিকার জোটের সভাপতি প্রভাষক আ ব ম আব্দুল মালেক বলেন, বনটি ধ্বংস করতে প্রভাবশালী মহল একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে স্থানীয় জনগণের প্রচেষ্টা রোধ করা হয়েছে।

Posted by কয়রার সংবাদ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যা ছিল চাওয়া, তা হল পাওয়া বিদায়ী ম্যাচ জিতলেন মাশরাফি

কয়রায় কপোতাক্ষ নদীতে ডুবে এক জনের মৃত্যু

দুর্গাপূজা উদযাপন উপলক্ষে কয়রায় দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নে আইন শৃংখলা সভা অনুষ্ঠিত