ঝুঁকিতে ভেড়ীবাঁধ : আতঙ্কে উপকূলবাসী

কয়রা ডেস্ক : খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের ঝুঁকিপূর্ণ ভেড়ীবাঁধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় উপকূলবাসী। উত্তাল নদী, আকাশে মেঘ আর আবহাওয়া বৈরী হলেই কালবৈশাখী ঝড়ের ভয়ে আঁতকে উঠে তাদের মন। ভেড়ীবাঁধ ভাঙ্গা জলোচ্ছ্বাসের আতঙ্কে কপালে ভাজ পড়ছে তাদের। নোনাপানির ভয়াবহতায় আদালতে মামলাও ঢুকছেন এলাকাবাসী।
খুলনার কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের গিলাবাড়ি, সিংহের চর, ধাড়িয়াখালী ও মহেশ্বরীপুর গ্রামে লবণ পানি উত্তোলন বন্ধের দাবিতে মামলা হয়েছে। ধান চাষের ক্ষতি করায় লবণ পানি উত্তোলন বন্ধের দাবি জানিয়ে স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল গফ্ফারসহ এলাকার কয়েকজন বাদী হয়ে কয়রা উপজেলা নির্বাহী আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন (নং-৯৯/১৭)। স্থিতিশীল বজায় রাখাসহ কারণ দর্শনো ও তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এতে ভেড়ীবাঁধেরও ব্যাপক ক্ষতি হয় বলে অভিযোগ মামলাটির বাদীপক্ষের। শুধু ওখানে নয়, খুলনার কয়রা ও দাকোপ, বাগেরহাটের শরণখোলা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় ভেড়ীবাঁধের অবস্থা খুবই নাজুক। দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় বাঁধের মাটি সরে গেছে।
পাউবো’র সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির খুলনা-১ এর অধীনে ৩৬৫ দশমিক ২৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। সংস্কারের অভাবে অন্তত ১০৯ কিলোমিটার ভেড়ীবাঁধের অবস্থা জরাজীর্ণ। পাউবো খুলনা-২ এর অধীনে ৫১০ কিলোমিটার ভেড়ীবাঁধের মধ্যে ৪৫ কিলোমিটার ভেড়ীবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ।
একই অবস্থা বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায়। বাগেরহাটের ৩১৮ কিলোমিটার ভেড়ীবাঁধের মধ্যে প্রায় ৬০ কিলোমিটার অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া প্রায় ৪০ কিলোমিটার ভেড়ীবাঁধ নিচু হয়ে গেছে। ভরা জোয়ারের সময় বাঁধের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। গেল বছরের ডিসেম্বরে ভেড়ীবাঁধ নির্মাণের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল এলাকাবাসী।
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতে, জেলার ৭৯৯ দশমিক ১০ কিলোমিটার ভেড়ীবাঁধের মধ্যে ২১০কিলোমিটার ভেড়ীবাঁধই ঝুঁকিপূর্ণ। দ্রুত সংস্কার করা না হলে আসন্ন দুর্যোগ মৌসুমে এসব ভেড়ীবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হতে পারে বিশাল এলাকা। দেখা দিতে পারে মারাত্মক বিপর্যয়।
কয়রার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের গোলখালী গ্রামের মোঃ তসলিম মোল্লা বলেন, “বসবাস করি খুলনা জেলার মধ্যে, কিন্তু আমাদের ভেড়ীবাঁধ সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায়। সঙ্গত, কারণে তারা আমাদের ভেড়ীবাঁধ সংস্কারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয় না। দীর্ঘদিন জরাজীর্ণ ৫ কিলোমিটার ভেড়ীবাঁধ এলাকাবাসী স্বেচ্ছাশ্রমে একটু সংস্কার করেছি। যে কোন মুহূর্তে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নটি, মানচিত্র থেকে মুছে যেতে বসেছে পাউবো’র অবহেলায়!”
কয়রা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আ খ ম তমিজ উদ্দিন বলেন, উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬টি ইউনিয়ন নদী ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী বিএম আব্দুল মোমিন জানান, “পাউবো-১ এর আওতায় ৩৭৭ দশমিক ১০ কিলোমিটার ভেড়ীবাঁধের মধ্যে ৬০ কিলোমিটার খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা এরই মধ্যে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে নোটশিট পাঠিয়েছি। কিন্তু আপাতত কোন বরাদ্দ নেই।”


সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী অপূর্ব কুমার ভৌমিক বলেন, পাউবো-২ এর ৪২২ কিলোমিটার ভেড়ীবাঁধের মধ্যে ১৫০ কিলোমিটার খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। নোটশিট পেশ করার পর সম্প্রতি ২ কোটি ২৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। খুব দ্রুত টেন্ডার আহ্বান করে কাজ শুরু করবো। তবে এই অর্থে মাত্র ১৫ কিলোমিটার ভেড়ীবাঁধ সংস্কার করা যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসে উপকূলবাসীর ভিটে-মাটি, সহায়-সম্পত্তি, স্বপ্ন চুর্ণ-বিচুর্ণ হয়েছে বারবার। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডরে প্রাণ হারায় উপকূলের অন্তত সাত হাজার বাসিন্দা। ২০০৯ সালে ২৫ মে আইলা আঘাত হেনে ছিল উপকূলে। ১৯৮৮ সালের ২৯ নভেম্বরের বন্যা, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের জলোচ্ছ্বাসের দুর্বিসহ স্মৃতিতে এখনো শিউরে উঠেন প্রত্যক্ষদর্শী ও ক্ষতিগ্রস্তরা।
উপকূলীয় সমস্যা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সিডিপি’র খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী এস এম ইকবাল হোসেন বিপ্লব বলেন, অপরিকল্পিত ভেড়ীবাঁধ আর স্লুইচগেট। চিংড়ির ঘেরে লবণপানি তোলার ওই স্লুইচগেটগুলো উপকূলের জন্য মরণ ফাঁদ। নদী খাল ভরাট হয়েছে, ফলে জলোচ্ছ্বাস হলেই উপকূলে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে। তাছাড়া যুগের পর যুগ ভেড়ীবাঁধগুলোর যথাযথভাবে সংস্কার না করে, যেনতেনভাবেই দায় সারছে কর্তৃপক্ষ। তাই উপকূলে বাঁধের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।
পাউবো খুলনা-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শরিফুল ইসলাম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভেড়ীবাঁধের বর্ণনা ও সংস্কার ব্যয় সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র প্রেরণ করেছি। প্রয়োজনীয় অর্থ না পাওয়ায় সংস্কার করতে পারছি না।
পাউবো খুলনা-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী পীযুষ কৃষ্ণ কুন্ডু বলেন, ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার ভেড়ীবাঁধ। কিছু স্থান নাজুক অবস্থায় রয়েছে। জোয়ার-ভাটার ভেড়ীবাঁধ, বলা যায় না। এই ভাল তো এই খারাপ। তবে আমরা নিয়মিত নজরদারি রাখছি।
কয়রার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের ভেড়ীবাঁধ প্রসঙ্গে খুলনা জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান বলেন, সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতা থেকে কয়রা উপজেলার অংশটা খুলনার (পাউবো’র) মধ্যে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছি। এ বিষয়ে উন্নয়ন কমিটির সভায় পাউবোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সাথে অবৈধ স্লুইচগেট বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Posted by কয়রার সংবাদ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যা ছিল চাওয়া, তা হল পাওয়া বিদায়ী ম্যাচ জিতলেন মাশরাফি

কয়রায় চিকিৎসার নামে দুর্নীতি, বদলির পিছনে কাহিনী

দুর্গাপূজা উদযাপন উপলক্ষে কয়রায় দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নে আইন শৃংখলা সভা অনুষ্ঠিত