খুলনায় তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ইয়াবা আসক্তি বাড়ছে


এখন ইয়াবার ব্যাপকতার হার ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। ফেনসিডিলসহ অন্য সব মাদককের ক্ষেত্রে এ অবস্থা। গত ৬-৭ বছর আগেও যে ইয়াবা অভিজাত নেশা হিসেবে পরিচিত ছিল, তা এখন খুলনা থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। মেয়েদের গোপন স্থানসহ চার পন্থায় ওইসব ইয়াবার চালান আসছে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলাগুলোতে। চলতি বছরের এ পর্যন্ত খুলনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মাদকবিরোধী ১৮৯টি অভিযান পরিচালনা করে। এর মধ্যে ৪৪টি মামলায় আসামি হচ্ছে ৪৯ জন। এ সময় ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক আটক করা হয়। খুলনায় মাদকের গডফাদার রয়েছে ২০ জন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে বিভিন্ন অভিযানে এ সব তথ্য বেরিয়ে আসে।
কেএমপির ডিবি অতিরিক্ত উপ কমিশনার এসএম কামরুল ইসলাম বুধবার এ প্রতিবেদককে বলেন, খুলনায় সাড়ে ৪শ’ খুচরা মাদক বিক্রেতার তালিকা করা হয়েছে। যার মধ্যে অর্ধেকের বেশি ইয়াবা বিক্রিতে জড়িত। এর বাইরে মাদক বিক্রেতাদের গডফাদার তালিকার প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া প্রত্যেক থানায় থানায় আলাদাভাবে মাদক বিক্রেতাদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, যারা স্বেচ্ছায় এ ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায় তাদেরকে পুনর্বাসন করার উদ্যোগ নিয়েছি। ইয়াবা বহন সহজলভ্য হওয়ায় এটা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আমার একটি টিম সর্বক্ষণিক ইয়াবা মাদক ব্যবসায়ীদের চিহিৃত করতে ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছেন। যারা ইয়াবা আসক্ত তাদের মধ্যে অধিকাংশই তরুণ-তরুণী। ভ্রাম্যমাণ ইয়াবা ব্যবসায়ীরা এখন শহর থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলের আনাচা-কানাচে ছেয়ে গেছে। এদের মূল শিকড় উপড়ে ফেলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। নগরীর সোনডাঙ্গাস্থ ইয়াবা ব্যবসায়ী বুবলীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার আস্তানা ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
খুলনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোঃ রাশেদুজ্জামান এ প্রতিবেদককে বলেন, সাগর পথে টেকনাফ হয়ে দেশে ইয়াবার চালান ঢুকছে। এটি একটি উত্তেজক মাদক। চালানগুলো বার্মা থেকে আসছে। চুয়াডাঙ্গা ও সাতক্ষীরা বর্ডার থেকেও ইয়াবার চালান খুলনা বিভাগে আসছে। চালানগুলো ইয়াবা বিক্রেতারা মাছের কার্টন, তাজা মুরগির মলদ্বার, পুরুষের মলদ্বার, কুরিয়ার সার্ভিস, মহিলাদের গোপন স্থানে বিশেষ প্রক্রিয়ায় এসব চালানগুলো আসছে। ইয়াবা সাইজে ছোট ও বহন সহজলভ্য হওয়ায় বিক্রেতারা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব খুচরা বিক্রেতাদের হাতে পৌঁছে যায়। আর খুচরা বিক্রেতারা মোবাইল, ম্যাচের খোসায় বহন করে এসব ইয়াবা সেবনকারীদের হাতে পৌঁছে দেন। একটি ম্যাচের মধ্যে ১০০ পিস ইয়াবা ভরে অনায়াসে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে চলে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন অভিযানে যে সব ইয়াবা উদ্ধার হচ্ছে তার মধ্যে সাদা, গোলাপি, নীল ও ব্রাউন কালারের ইয়াবা পাওয়া যাচ্ছে। এদের নামও একেক রকম। এর মধ্যে আর-সেভেন, ডাব্লিউওয়াই, বিসি, ডাব্লিউ ও আই ইয়াবার নাম উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে আর-সেভেন এর দাম ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা পিস ছিল। এখান এর দাম কমের দিকে। ইয়াবা বহনের ক্ষেত্রে বিক্রেতা বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করায় এটা সহজে ধরা যায় না। ফলে অনেক সময় অভিযানে গেলেও আমরা সফল হতে পারিনা। এ জন্য তিনি সমাজের রাজনীতিক থেকে শুরু করে সবার সহযোগিতা কমনা করেন। তার দেওয়া তথ্য মতে, খুলনায় ২০ জন মাদক বিক্রির গডফাদারের তালিকা রয়েছে। তাদের মোবাইল ট্র্যাকিং এর জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
খুলনা জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সূত্র মতে, ২০১৭ সালের এপ্রিলের ১১ তারিখ পর্যন্ত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে ১৮৯টি। এর মধ্যে নিয়মিত মামলার সংখ্যা ৩৪টি, মোবাইল কোর্ট ১০টি, নিয়মিত মামলার আসামি ৩৯ এর মধ্যে পলাতক রয়েছে ৭ জন ও মোবাইল কোর্ট মামলার আসামির সংখ্যা রয়েছে ১০ জন। এ সময়ের মধ্যে গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদক উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ইয়াবা ২ হাজার ১৮০ পিস।


ওই সূত্র মতে, জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ে মঞ্জুরিকৃত ২৪টি পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ৮টি পদ। এর মধ্যে একজন হিসাব রক্ষক, সিপাহী ৫ জন ও আউট সোর্সিংয়ে নিরাপত্তা প্রহরী ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী ১টি পদে একজনও নেই। দুইটি সার্কেলের জন্য একটি মাত্র যানবাহন থাকায় সব সময় সময়মতো মাদকবিরোধী অভিযান চালানো সম্ভব হয়ে ওঠে না।
জানা গেছে, খুলনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে খুলনা জেলায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র অনুমোদনের সংখ্যা রয়েছে ৬টি। এসব জায়াগায় বিভিন্ন মাদকে আসক্ত মানুষেরা চিকিৎসা সেবা নিয়ে থাকেন। এসব প্রতিষ্ঠানে গাঁজা ও ইয়াবা আসক্ত তরুণ-তরুণীরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য চিকিৎসা সেবা নিয়ে থাকেন। যাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ ইয়াবা আসক্ত।
প্রগতি মানসিক রোগ ও মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক বিধান বিশ্বাস এ প্রতিবেদককে গতকাল বুধবার বলেন, বর্তমানে তার কেন্দ্রে যেসব মাদকাসক্ত রয়েছে তার মধ্যে ইয়াবা ও গাঁজা আসক্তের সংখ্যা বেশি। এর মধ্যে পুরুষের পাশাপাশি মেয়েরাও রয়েছে। তিনি বলেন, এখান থেকে মাদকসেবীরা সেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে ফিরে যাচ্ছে। কেউ কেউ আবার পুনরায় মাদকে আসক্ত হচ্ছেন। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে তাদেরকে অবমূল্যায়ন করায় তারা এ পথে ফিরে আসছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার কেন্দ্রে বর্তমানে ২০ জন মাদকাসক্ত রয়েছেন। তার মধ্যে দুইজন রয়েছে মেয়ে। ইদানীং স্কুলপড়ুয়া শিশু-কিশোরদের মধ্যে বিশেষ করে প্রাইভেট ভার্সিটির শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদক গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে। উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত সব পরিবারেই এ প্রবণতা দেখা যায়। তবে ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানদের মধ্যে ইয়াবার ঝোঁক বেশি দেখা যায়।
জানা গেছে, নগরীর সোনাডাঙ্গাস্থ জামাই রাজু ওরফে মাস্টার, ছোট রাজু, আউলিয়া সাগর, হামিদা (পলাতক), সরোয়ার, থ্রি স্টার নামে পরিচিতি জাহানারা, হোসনেয়ারা ও লুতু। এরা ইয়াবা ও ফেনসিডিল বিক্রি করে। এরা একাধিকবার আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছে। পরবর্তীতে জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় এ ব্যবসায় ফিরে যায়।
খুলনায় ৫০ হাজার মাদকাসক্ত রয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র খুলনা মহানগরীতে রয়েছে অর্ধেকের বেশি। মাদক সেবনকারী সিংহভাই তরুণ-যুবক-যুবতী। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে তাদের স্কুল ব্যাগে করে মাদক বহন ও বিক্রি করতে পারে। যে কারণে মাদক বিক্রেতাদের এখন প্রধান টার্গেট শিক্ষাথীরা। মাদকের মধ্যে ইয়াবা ও ফেন্সিডিল সেবনকারীর সংখ্যা বেশি। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বর্তমানে মাদক সেবনে জড়িয়ে পড়েছেন। প্রথম দিকে ইয়াবা সীমাবদ্ধ ছিল উচ্চবিত্তদের মধ্যে। এখন সমাজের সব শ্রেণির মানুষই এই নেশায় আসক্ত। একাধিক মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে এ তথ্য জানা যায়।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যা ছিল চাওয়া, তা হল পাওয়া বিদায়ী ম্যাচ জিতলেন মাশরাফি

কয়রায় চিকিৎসার নামে দুর্নীতি, বদলির পিছনে কাহিনী

দুর্গাপূজা উদযাপন উপলক্ষে কয়রায় দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নে আইন শৃংখলা সভা অনুষ্ঠিত